অঙ্কের চিত্রায়ণে নেই প্রাণ

MAB Rating:
3

কল্লোল লাহিড়ী
কলকাতা, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৩

Movie Review of Shunyo Anko

বরফ ঝরার রোমান্টিকতা ক্লান্ত করে। ছবি- ব্র্যান্ড ভ্যালু কমিউনিকেশনস।

প্রাকৃতিক সম্পদকে উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে চায় সভ্য সমাজ। বিশ্বের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে এটা এখন জরুরি। শক্তিশালী হবে রাষ্ট্র। বাড়বে কর্ম সংস্থান। আমরা এগিয়ে যাবো আরও এক নতুন পৃথিবীর দিকে। কিন্তু সেই পৃথিবীটা কেমন? যেখানে থাকবে না পাহাড়, নদী, জঙ্গল। থাকবে না ইট-কাঠ-পাথর থেকে পালিয়ে বাঁচার দু-দন্ড অবকাশ। থাকবে না সেই সমস্ত মানুষগুলো যারা এতদিন এই প্রকৃতিতে বেড়ে উঠেছে। কারণ ততদিনে উন্নয়ের নামে, এগিয়ে চলার অছিলায় আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি আমাদের নিজেদের বেঁচে থাকার স্পেসটাকে।

তাহলে এই জীবন যুদ্ধের কঠিনতম সমীকরণে আমরা কোন অঙ্ককে মেলাব? উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে? নাকি ধ্বংসের যজ্ঞলীলাকে? প্রলোভনের হাতছানিতে এগোব? নাকি বড় মায়ায়, মমতায় ফিরে যাব শিকড়ের কাছে? গুছিয়ে রাখব ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি নামের নানান আধারকে, যেগুলো এখন এই মুহূর্তে নানান জটিল সমীকরণে নিবদ্ধ। নানা প্রশ্নে জেরবার। তাহলে কি এই উন্নয়ন, এই সন্ত্রাস, এই প্রগতি আসলে এক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাওয়া? শূন্যের বিলীয়মান জগতে ভেসে থাকা? প্রশ্নগুলো উঠে আসে বড় বেখাপ্পা এই সময়ে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। সেই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে চায় কয়েকটি চরিত্র আখ্যানের নটি অঙ্ক ধরে। আর শেষ অঙ্কে পরিচালক গৌতম ঘোষকে ফিরে যেতে হয় শূন্যে। তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি ‘শূন্য অঙ্কে’।

গ্রিক ট্র্যাজেডির আঙ্গিকে ছবির আখ্যানকে দশটি ভাগে ভাগ করেন পরিচালক। প্রত্যেকটি ভাগ স্বয়ং সম্পূর্ণতার দাবি রাখে না। তবে প্রত্যেকটি ভাগ আমাদের নিয়ে যায় কোনও এক বার্তার দিকে। এই দশটি ভাগে কয়েকটি চরিত্র যেমন উঠে আসে ঠিক তেমনি কতকগুলি প্রশ্নের সামনে নিজেরাই দাঁড়িয়ে পড়ে। অসহায় বোধ করে। বেড়িয়ে আসতে চায় নিজস্ব চেনা গন্ডির বাইরে। কখনও বা তার মধ্যেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। অগ্নি বসু (প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়) এক বহু জাগতিক সংস্থায় উচ্চ পদে প্রতিষ্টিত ব্যক্তি। তার নজর পূর্ব ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের বক্সাইটে ভরা পাহাড়গুলোর দিকে। সেখানে বক্সাইট তোলা হলে উন্নয়ন হবে। ভোল পাল্টাবে জগতের, দেশের। এই ছবির কথক সে। আখ্যান তাকে ধরেই এগোয়। অগ্নির স্ত্রী ঝিলিক (প্রিয়াঙ্কা বসু) প্রাক্তন এয়ার হোস্টেজ। একাকিত্ব আর অ্যালকোহলের মাঝে তার সুরে ধরা পড়েন রবীন্দ্রনাথ, ধ্রুপদী সঙ্গীত। রাকা (কঙ্কণা সেনশর্মা) একজন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। আদিবাসীদের সঙ্গে থেকে কাজ করছে। তার মনে হচ্ছে রাষ্ট্র অন্যায় করছে এই আদিবাসীদের ওপর। তাদের ন্যায্য পাওনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আদিবাসীরা। হয়তো সেই প্ররোচনায় তাদের হাতে উঠে আসছে আগ্নেয় অস্ত্র। রাকা ভাব জমাচ্ছে অগ্নি বসুর সঙ্গে। নতুন করে ভাবনার পথে আর একবার দাঁড় করাচ্ছে রাকা অগ্নিকে। আবার ডাক্তার প্রবাল রায় (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) মানুষের মৌলিক অধিকারে বিশ্বাসী। জঙ্গলের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে তিনি সেই সমস্ত মানুষদের চিকিৎসা করেন যারা সংবিধানে উল্লিখিত দেশের নাগরিক হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, এবং কর্মসংস্থানের মতো খুব সাধারণ অথচ অত্যাবশ্যকীয় মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কবীর চৌধুরী (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) এক বিজ্ঞানী। যুদ্ধে জর্জরিত এই পৃথিবীকে বাঁচাতে গোপনে কাজ চালান এক সাইবার স্পেসে। শান্তি ফেরাতে জন্ম দেন নতুন নতুন ভাইরাসের। তাঁর মনে হয় একদিন তিনি শান্তি ফিরিয়ে আনবেন এই রক্তক্ষয়ী পৃথিবীতে। শূন্যে বিলীন হবে সব কিছু, আবার পুনরুত্থান শূন্য থেকেই।

চরিত্রদের একটা বড় অংশ জড়িয়ে থাকে স্মৃতি-সত্ত্বা আর ইতিহাসে। কিন্তু সে কেমন স্মৃতি? সেই সব ব্যথাতুর স্মৃতি যেগুলো প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় চরিত্রদের। অগ্নি বসুর দাদা সত্তরের দশকে প্রাণ দেয় পুলিশের হাতে। অগ্নির স্বপ্নে, চিন্তা-ভাবনায় ফিরে আসে বাবা। নাগরিক সুখ-সুবিধে ভরা উথলে ওঠা সংসারে কোথায় যেন ঘিরে ধরে তাকে ঠিক-বেঠিকের নিয়ম জাল। রাকা ফিরে যায় তার মৃত বালক বন্ধুর স্মৃতিচারণে। যার দু'চোখ ভরা ছিল এক নতুন যুগের স্বপ্ন। তাকেও তো চলে যেতে হয়েছে অচিরে এই পৃথিবী ছেড়ে। কবীর চৌধুরী প্রাণের এক সখাকে হারান কাশ্মীরে। আদিবাসীদের সত্ত্বায় জড়িয়ে থাকে পাহাড়, মাটি, জঙ্গল। তাদের কাছে প্রকৃতি আসলে দেবতা। দু'চোখ ভরে উজাড় হয়ে থাকে সরল স্বপ্ন। আর উন্নয়ন? প্রগতি? রাষ্ট্রের নামে সন্ত্রাস? হ্যাঁ, সেগুলোকেও পাশাপাশি রাখেন পরিচালক। গ্রেপ্তার হন ডাক্তার প্রবাল রায়। সাধারণ মানুষের পাশে থাকার জন্যে। মাইনে উড়ে যায় গাড়ি। আর এইসবের ফাঁক-ফোঁকড় দিয়ে কখনও ঢুকে পড়েন লালন সাঁই, রবীন্দ্রনাথ, উম্বের্তো ইকো প্রমুখ। অগ্নির সঙ্গে এক ক্যালাইডোস্কোপিক ভিউতে আমরাও দেখার চেষ্টা করি এই সময়কে, এই শহরকে, এই রাষ্ট্রকে।

কিন্তু প্রশ্ন হল এবার, এই দেখায় কতটা প্রাণ আছে? কতটা মমতা আছে? আর কতটা আছে বিষয়ের গভীরে যাওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছা? যে মানুষগুলোর অধিকার নিয়ে কথা হচ্ছে, তাদের দাবির পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে যে কয়েকজন, তারা বড় নিরস। শহুরে ছন্দে তাদের জীবনে নানা উপমায়, নানা বিশ্লেষণে চকিতে উদ্ধৃতি কোডে ধরা পড়ছে প্রজ্ঞা। কিন্তু মনের টানটা কোথায়? বড় অ্যাকাডেমিক তত্ত্ব আর বিশ্লেষণের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির গন্ধটা। বড় মায়াহীন, মমতাহীন লাগে গৌতমের এই জগতকে। একশো চল্লিশ মিনিটের ছবি ক্লান্ত করে পুনরুক্তি বিভাজনে অগ্নি ঝিলিকের দৃশ্যে। এমনকি বরফ ঝরার রোমান্টিকতায়। অথচ যখনই ক্যামেরা চলে আসে লাল মাটির অন্তরে, ঢুকে পড়ে প্রত্যন্ত জঙ্গলে ঘেরা গ্রামের স্কুলে, বাবা সাহেব অম্বেদকরের জন্মদিন পালনে কিম্বা ধামসার উন্মত্ত তালে, তখন কোথাও চকিতে দেখা দিয়ে যান সেই গৌতম, যিনি একদিন ‘দখল' উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখানে আছে অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা, নেই শুধু প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটা।

পরিচালনা, চিত্রগ্রহণ, সঙ্গীত : গৌতম ঘোষ
প্রযোজনা : ব্র্যান্ড ভ্যালু কমিউনিকেশনস
অভিনয় : প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়, কঙ্কণা সেনশর্মা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, অরিজিৎ দত্ত, প্রিয়াঙ্কা বসু, ললিতা চট্টোপাধ্যায়, বরুণ চন্দ প্রমুখ