স্প্লিট-পার্সোন্যালিটি, গোলাপি গরু এবং মাও-সে-তুং

MAB Rating:
3

অনির্বাণ চৌধুরী
কলকাতা, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৩

Movie Review of Matru Ki Bijlee Ka Mandola

চিত্রনাট্য বলছে, এটা একটা ব্ল্যাক কমেডি। ছবি- বিশাল ভরদ্বাজ ফিল্মস।

পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ-এর 'মটরু কি বিজলি কা মন্ডোলা' ঠিক কোন জাতের ছবি? চিত্রনাট্য বলছে, এটা একটা ব্ল্যাক কমেডি। যেহেতু কৃষ্ণ-কৌতুক, তাই ছবিটার আগাগোড়া অন্ধকার এবং কিছু নিষ্ঠুর, কিছু সরল মজায় ঠাসা। এছাড়া বলা যায়, এটা ২০১৩-র একটা মাওবাদী টেক্সট, যেখানে একই মানুষের দ্বৈতসত্ত্বার দ্বন্দ্ব ঘিরে রাখে ছবিটাকে।পাশাপাশি, চূড়ান্ত রকমের নেশার ছবি হিসেবেও মনে ধরে ছবির বিভিন্ন দৃশ্য। গভীর নেশায় চারপাশটা যেরকম মৃদু এবং ঘন হয়ে আসে, বিশালের এই ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফিও ঠিক তেমন। বড় অপূর্ব, বড় ঘোরলাগা। তাই অন্ধকার আর লাল-হলুদ-সবুজের মতো প্রাথমিক রঙ গোড়া থেকেই চোখকে আরাম দেয়। কিন্তু স্বস্তি দেয় না; নেশায় ঠিক যেমনটা হয়।

স্বস্তিতে থাকতে দেয় না চরিত্রগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্বও। মটরু দিনরাত স্বৈরাচারী উদ্যোগপতি মন্ডোলার সঙ্গে ছায়ার মতো সেঁটে থাকে, অন্যদিকে কৃষকদের চাষের জমি যাতে তাদের বেহাত না হয়ে যায়, সেই জন্য তাদের কাছে মাও-এর বার্তা পাঠায়। বিপ্লব পাছে ব্যর্থ হয়, পাছে সে আটকে যায় স্বৈরাচারী মালিকানার কাছে- এই অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে সে মন্ডোলাকে মদ খাওয়ায় প্ররোচনা দেয়। কেন না, পেটে মদ পড়লেই স্বৈরাচারী হ্যারি মন্ডোলা উবে যায়, তার জায়গায় মুখোশ খুলে সামনে আসে ভূমিপুত্র হরিয়া মন্ডোলা। এই স্বৈরাচার আর সাম্যের মাঝামাঝি থাকা, এই মদ খাওয়া এবং না-খেতে চাওয়া- এই দ্বন্দ্বেই জেরবার হয় মন্ডোলা। অন্যদিকে বিজলির দ্বন্দ্ব নিজের সঙ্গেই। যা তার মন মেনে নিতে চায় না, সেটার সঙ্গেই মানিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে সে মটরুর ভাষায় আটকে থাকে দুঃখবিলাসের ‘মীনাকুমারী কমপ্লেক্স’-এ। আর এসবের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে কখনও কখনও চিত্রনাট্য হয়ে যায় খুব সাদামাটা; এতটাই যে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যের গতায়াতে ঝাঁকুনি আসে, আর তাকে চিত্রনাট্যের ভুল বলে ভ্রম হয়।

এই ভুল-বোঝাবুঝির জায়গাটুকু বাদ দিলে বিশালের ছবিতে কিন্তু নিখাদ মজার অভাব নেই। এই মজা তৈরি হয়েছে বলাই বাহুল্য অভিনয়ের গুণে। আর কিছু অ্যানিমেশনের গুণে। আজকাল অনেক ছবিতেই দেখা যায় অভিনয়ের পাশাপাশি অ্যানিমেশনের মিলমিশ, তারই সার্থক প্রয়োগ দেখা গেল এই ছবিতে। অ্যানিমেশনে তৈরি গলার ঘন্টা নেড়ে গুলাবো নামের গোলাপি যে মোষ মানুষকে নিশির মতো ডেকে নেশার পথে নিয়ে যায়, তাকে অনেক দিন মনে রাখবে বলিউড। অ্যানিমেশনের এই সৃষ্টিকে ছবির একটা কেন্দ্রীয় চরিত্র বললেও ভুল হয় না। আর মানুষেরা? তাঁদের অভিনয় কেমন?

এই ব্যাপারে সবার প্রথমেই নাম করতে হয় পঙ্কজ কপূরের। এই বয়সেও তাঁর প্রাণশক্তি বিস্ময় জাগায়। সত্যি বলতে কী, পঙ্কজ কপূর আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শাবানা আজমির অভিনয় দেখার জন্য বার বার দেখা যেতে পারে 'মটরু কি বিজলি কা মন্ডোলা'। সেই তুলনায় ইমরান খান-এর অভিনয় নিছকই সাদামাটা; অনুষ্কা শর্মা ভাল হলেও বিশালের চিত্রনাট্য তাঁকে ফের ফুরফুরে একটি মেয়ের টাইপকাস্টে হাজির করল। সেই তুলনায় বরং চমকে দেন আর্য বব্বর; বোকামির চূড়ান্ত নমুনা হয়ে।

তবে বিশাল ভরদ্বাজের ছবির আরও কিছু উল্লেখযোগ্য দিক থাকে; বিশাল নিজে যে বেশ জনপ্রিয় সঙ্গীতকার। এখনও পর্যন্ত তাঁর প্রত্যেকটি ছবির গানই অল্প-বিস্তর জনপ্রিয় হয়েছে। এই কাজে তাঁকে সব সময় সাহায্য করেন গুলজার; গান লিখে। বিশাল ভরদ্বাজের ছবি মানেই রেখা ভরদ্বাজের একটা মন-উদাস করা গান- এও যেন স্বাভাবিক একটা পাওনা। দুঃখের কথা, এবার এই ছবিতে সবকটা ফ্যাক্টর থাকলেও জনপ্রিয় কোনও গান তৈরি হল না।

পরিচালনা : বিশাল ভরদ্বাজ
প্রযোজনা : বিশাল ভরদ্বাজ, রেখা ভরদ্বাজ
সঙ্গীত : বিশাল ভরদ্বাজ
গীতিকার : গুলজার
অভিনয় : পঙ্কজ কপূর, অনুষ্কা শর্মা, ইমরান খান, শাবানা আজমি, আর্য বব্বর প্রমুখ