একুশে আইনের মধুচন্দ্রিমা

MAB Rating:
2

কৌস্তূভ দাশগুপ্ত
কলকাতা, ১১ জানুয়ারি, ২০১৩

Movie Review of Table No 21

খেলার ধাপে একে একে যোগ হয়েছে যৌনতা। ছবি- ইউটিভিমোশনপিকচার্স

'শিব ঠাকুরের আপন দেশে/আইনকানুন সর্বনেশে' হলেও ‘টেবিল নম্বর টুয়েন্টি ওয়ান’-এর পটভূমি কিন্তু ফিজি! ফিজি দ্বীপপুঞ্জের অসাধারণ নৈসর্গিক আবহে তৈরি এই রোমাঞ্চকর থ্রিলার জুড়ে আছে নানান বিকট বীভৎস নিয়মকানুনের কথা। আর এই নিয়ম এক অদ্ভুতুড়ে ‘অন-লাইন রিয়্যালিটি গেম শো’-র।

নায়ক ভিভান (রাজীব খাণ্ডেলওয়াল) এবং নায়িকা সিয়া (টিনা দেশাই) তাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের জন্য ছুটিতে আসে ফিজির এক বিলাসবহুল রিসর্টে। বেকার ভিভান ‘লাকি ড্র’-তে বিজয়ী হয়ে ফিজি আসার সুযোগ পায়। যদিও‍ তাদের দাম্পত্যজীবন জুড়ে রয়েছে আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য, তবু তাদের সুখী দম্পতি হিসেবেই দেখানো হয়েছে। মধুচন্দ্রিমায় লোভ-লালসার পিচ্ছিল পথে পা দিয়ে এই দম্পতি ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে ‘টেবিল নম্বর টুয়েন্টি ওয়ান’ নামক এই রোমহর্ষক গেম শো’-তে। খেলার পুরস্কারমূল্য একুশ কোটি টাকা। খেলার শর্ত একটাই সত্য, সত্য এবং সত্য, নচেৎ পালাবার পথ নাই; যম আছে পিছে। যে কোনও মিথ্যাচার প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে যেতে পারে মৃত্যুর মুখে। বুদ্ধিমান দম্পতি কীভাবে যে এই মৃত্যুজালে জড়ালেন, কীভাবেই বা গেম শো তথা একুশে আইনের শিবঠাকুর থুড়ি কর্ণধার মিস্টার খানের (পরেশ রাওয়াল) প্রগলভ প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হলেন, সে না হয় অন্য বিষয়। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া যায়, এই ছবি সারা পৃথিবীজুড়ে যারা রিয়েলিটি শো’-এর নামে মানুষের একান্ত গোপনীয়তা, আবেগ এবং মানবতা নিয়ে বাণিজ্য করে তাদের প্রতি এক ব্যঙ্গাত্মক ধিক্কার- তবে মন্দ লাগে না।

কেন না খেলার ছলে খান এই জুটির ওপর যথেচ্ছাচার চালান। খেলার ধাপে ধাপে প্রতিটি প্রশ্নোত্তরে এবং কার্যাবলীতে একে একে যোগ হয়েছে যৌনতা, অ্যাকশন, মেলোড্রামার মতো সবক’টি মশলাপাতি; আছে চুম্বন, আছে নগ্নতা, আছে বন্দুক, হকিস্টিক, দুর্দান্ত মারপিট। আছে রক্তের বিনিময়ে নায়ক-নায়িকার জীবনদানের মতো চূড়ান্ত মেলোড্রামা। তবে সিনেমার পোস্টারে যতটা লাস্য আর উদ্দামতা দেখা যায়, ততটা আশা করলে হতাশ হবেন। থ্রিলারের ধারাবাহিকতা মাঝেমধ্যেই বিঘ্নিত হয়, তবু বুদ্ধিমান দর্শক বিচ্ছিন্নতা অনুমান করতে পারবেন। ছবির প্রেক্ষাপট আর পরেশ রাওয়ালের উপস্থিতি বারবার মনে করিয়ে দেয় অনুরাগ কাশ্যপের ‘নো স্মোকিং’-এর কথা। এই ধরনের চরিত্রে পরেশ রাওয়াল এতটাই অনায়াস সাধ্য যে তাঁর কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজীব খাণ্ডেলওয়াল ভাল অভিনয় করলেও নতুন কিছু করলেন না। বরং নতুন মুখ টিনা দেশাই অভিনয়ে সামান্য আড়ষ্ট হলেও দুই খণ্ডের বস্ত্রে ভীষণই ঋজু এবং তীক্ষ্ণ। বহুদিন পরে কোনও নায়িকাকে বিকিনিতে এত আত্মবিশ্বাসী হতে দেখা গেল। ঠিক তাঁর পাশে সাদা গেঞ্জিতে রাজীব ততটাই ফ্যাশন বিপর্যয়ের উদাহরণ হয়ে রইলেন।

সিনেমার ‘মিউজিক টিম’ একেবারে আনকোরা, গানের ভূমিকাও ভারতীয় ছবির তুলনায় যৎসামান্য। গীতিকার আসিম আহমেদ আব্বাসি এবং সুরকার গজেন্দ্র ভর্মা দু’জনেই নবাগত। আজকাল বাংলা ছবির গানের মাঝে হিন্দি পংক্তি এবং হিন্দি গানের মাঝে ইংরেজি স্ট্যাঞ্জা ব্যবহার করা এক নতুন রীতি। এই ছবির গান-ও সেই রীতির অনুগামী।

তবে ছবির সব চাইতে ভাল অংশ হল শেষটুকু। রহস্যের উন্মোচন ঘটল এমন এক বাস্তবতায় যা নিয়ে বহুদিন কোনও আলোচনা হয়নি। এবং যা নিয়ে বহুল আলোচনা প্রয়োজন। দুর্বল, অধস্তন ব্যক্তিকে, অথবা যারা ‘অন্যরকম’, তাদের উক্তত্য করায় আমাদের যে উগ্র অমানবিক প্রবৃত্তি- এই চলচ্চিত্র তার বিরুদ্ধে এক সজোর চপেটাঘাত। কলেজ ক্যাম্পাসে জুনিয়রদের ওপর দাদাদের যে পৈশাচিক জুলুম করার প্রবণতা, তাকে যেন পরিচালক কান মুলে দিলেন। জীবনে কখনও কোনওদিন যাঁরা র‍্যাগিং-এর শিকার হয়েছেন, তাঁদের নিশ্চিতভাবে দুই ভিন্নধর্মী অনুভূতি হবে এই ছবির শেষে। কেন না, কাহিনিকার এক ঘটনায় সব কিছুর মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। নায়ক এবং খলনায়ক সত্য এবং মিথ্যা- সব কিছু উল্টে দিলেন। একুশে আইন ক্রমশ তার স্বরূপে প্রকাশ পেল।

পরিচালনা : আদিত্য দত্ত
প্রযোজনা : ভিকি রজনী, সুনীল লুলা
অভিনয় : পরেশ রাওয়াল, টিনা দেশাই, রাজীব খান্ডেলওয়াল প্রমুখ