বারোমাসির বাঙালি কথা

MAB Rating:
3

স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা, ৯ জানুয়ারি, ২০১৩

Movie Review of Maach Mishti & More

দেখতে ভাল লাগে ছবিটি। ছবি- মোজো এন্টারটেনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড

বাঙালি তুমি আজ কেমন? আজকের চলমান কলকাতার প্রাণে, মনে তুমি কেমন করে মিশেছ? তোমার কাছে সম্পর্ক আসছে কোন ভাললাগায়? তোমার সাবেকি পরিবারে কেমন করেই বা ঢুকে পড়েছে ‘গ্লোবাল’ বাঙালির হতাশ্বাস?-এই একরাশ 'কেমন'-এর উত্তর বলতে চেয়েই কলকাতার সিনেমা হল-এ ঘুরে ফিরছে মৈনাক ভৌমিকের ছবি ‘মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর’।

মৈনাকের এই ছবিতেও সম্পর্ক, কলকাতা, পরকীয়ার সুর- কিন্তু সুবিধা একটাই, সেখানে কোনও আরোপিত দৃশ্যায়ন নেই। বরং অনেক বেশি প্রাঞ্জল, বাস্তববাদী কমিক সংলাপ আর চিত্রনাট্য ছবির চরিত্রদের জীবন্ত করে তুলেছে। তবে ছবির বক্তব্য থেকে পরিচালনা যেখানে এতটাই অনুভূতিপ্রবণ, যেখানে একফালি ভরাট আকাশ বা মানুষ ফুরিয়ে যাওয়া একলা বিছানা দর্শকদের নিজের মুহূর্ত হয়ে উঠেছে, সেখানে ছবির নামকরণ কেন ‘মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর’? স্পষ্ট বোঝা যায় না। বাঙালির মাছ আর অ-বাঙালির কাজু বরফি- এই ভেবে নিশ্চয়ই মৈনাক এই ছবির সরলীকরণ করতে চাইবেন না।

আমি অন্তত চাই না। তাহলে ভাল মেকিং, মানানসই দৃশ্যের ছন্দে চলা নীল দত্ত-র তত্ত্বাবধানে চমৎকার গান, মন-কাড়া অভিনয় সব মাটি হয়ে যাবে। কেননা, দেখতে ভাল লাগে ছবিটি, দেখতে দেখতে একটা ফিল গুড মন তৈরি হয়। বাঙালি পরিবারের তিন ভাই-এর সেন্টিমেন্ট সামান্য হলেও ‘গল্প হলেও সত্যি’-র সেন্টিমেন্ট ছুঁয়ে যায়। শৌভিক, পরমব্রত এবং অনুব্রত-র তিন ধারার অভিনয় এখানে উল্লেখযোগ্য। অনুব্রত-র চরিত্রটি মনোরম, প্রেমিকা এবং চালক নেহা পান্ডা-র (গার্লফ্রেন্ড) কোমর ধরে বাইকে ঘোড়া বা প্রবল উদ্দামে নেহার লাজুক অনুব্রতকে পাঁজাকোলা করার দৃশ্য ছবির সিরিয়াস কমেডিকে জানান দিয়ে যায়। আজকাল বাংলা ছবিতে উপযুক্ত কমেডির বড় অভাব। সেই খামতি এই ছবি খানিকটা পূরণ করবে বলে মনে হয়। আর সিরিয়াস, কারণ লাজুক রাঙা মেয়ে আর পৌরুষের পাগলপনার বাইক চড়া টিপিক্যাল বাংলা ছবির দৃশ্যের বাইরে এসে এই ছবি নিজের মতো করে ভালবাসার কথা বলতে পারে। এই দৃশ্যে জেন্ডার আর পাওয়ারের একপেশে তত্ত্ব থেকে এই ছবি বেরিয়ে এলেও শৌভিক আর পামেলার সম্পর্কটাকে বড় ক্লিশে করে দেখায়। কর্পোরেট দুনিয়ার ভ্যাম্পগার্ল গোছের চরিত্র করে কেন পামেলাকে দেখালেন পরিচালক? এখানে দ্বিতীয় শরীরী নারী-র তকমা দেওয়ার কি খুব প্রয়োজন ছিল? দীর্ঘ রোম্যান্সে বিশ্বাসী নয়, এমন ডিভোর্সি নারী মানেই কি অন্যের সংসার ভাঙার অপরাধী সে? তাছাড়া আর কোনওভাবেই কি তাকে বোঝানো যায় না?

সাবলীল অভিনয়ে ছবিতে চমকে দিয়েছেন অজপা মুখোপাধ্যায়। উপযুক্ত চরিত্র পেয়ে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, রাইমা সেন, নেহা পান্ডা, পার্নো মিত্র মন-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করেছেন। ওঁদের অভিনয়ে মনে হয় ওঁরা খুব চেনা কেউ, ঠিক যেন পাশের বাড়ির মেয়ে। অনুরাধা রায়-এর অভিনয়-ও প্রাণবন্ত। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে এক ভিন্ন ‘দাদু’-র ফ্লেভারে দেখতে বেশ লাগে। তাঁর চরিত্রর মধ্যে দিয়ে পরিচালক বাঙালির ফেলে আসা নস্ট্যালজিয়ার শব্দ, গন্ধ আর অনুভূতিকে আজকের কসমোপলিটান কলকাতার ব্যস্ত পথে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই ফেরার মাঝেই মিশে আছে পুরনো আর নতুন- দুই পিঠের ব্যস্ত মহানগরী, যার নাম কলকাতা। যার হাই রাইজ থেকে টানা রিক্সা, ক্যাফে থেকে কফি হাউস ঘিরে থাকে আমাদের বারোমাসির জীবন, যার দৃশ্যই ফিরেছে মৈনাক-এর ছবি ভাবনায়।

পরিচালক : মৈনাক ভৌমিক
প্রযোজনা : মোজো এন্টারটেনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড
সঙ্গডত : নীল দত্ত
অভিনয় : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, পার্নো মিত্র, নেহা পান্ডা, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, অনুব্রত বসু, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, শৌভিক কুন্দগ্রামি প্রমুখ