ভালবাসার রঙে ছাপানো দিনগুলি

MAB Rating:
3

কল্লোল লাহিড়ী
কলকাতা, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১২

Movie Review of Bojhena Se Bojhena

ভালবাসায় মোড়া দিনগুলোর এক নিদারুণ পরিণতি। ছবি- শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস

একটা দুর্ঘটনা। কয়েকটি মৃত্যু। কতকগুলো স্বপ্ন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাওয়া। ভালবাসায় মোড়া দিনগুলোর এক নিদারুণ পরিণতি। হ্যাঁ, এইসব নিয়েই বছরের শেষে ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’-র শুভমুক্তি আপনারই আশেপাশের সিনেমা হলে।

নূর থাকে মুর্শিদাবাদের শিবপুরে। রিয়া থাকে মালদায়। জয়ী বালুরঘাটের আর অভীক কলকাতার ছেলে। জীবনের মোড়ে ওদের দেখা হয় অন্যরকম ভাবে, অন্য অনুষঙ্গে। কিন্তু প্রজাপতির রঙিন ডানায় ভর করে ভালবাসা ওদের নতুন পথ দেখায়। ওরা একসঙ্গে থাকতে চায়, হাত ধরতে চায় একে অপরের। ঘর বাঁধার আশায় ওরা সবাই রাস্তায় বের হয়। আর রাস্তাই কেড়ে নেয় ওদের রঙিন স্বপ্নগুলোকে। নিয়তি বোঝে না ভালবাসা, স্বপ্ন, দু'চোখ ভরে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। ছবির শুরুতেই তাই স্বপ্ন ভঙ্গ হয় আমাদের। এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী।

চিত্রনাট্যের অসাধারণ মুন্সিয়ানায় ফ্ল্যাশব্যাক আমাদের গল্প বলে। আর চোখের সামনে উজাড় হতে থাকে ভালবাসার টুকরো টুকরো মুহূর্ত। উজাড় হতে থাকে বাংলার শহর থেকে মফস্বল, তার রাস্তা ঘাট, মাঠ-নদী, সব কিছু। ক্যামেরা যৌবনেরই প্রতীক হয়ে এখানে বড় ছটফটে। সে শুধু ছুটে বেড়ায় অতীত থেকে বর্তমানে। এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে। সম্পাদনার প্রকৌশল বলে, আসলে আপনি দেখতে বসেছেন এমন এক সময়ের ছবি, এমন এক মন কেমন করা, এমন-ই এক ভাললাগা আর ভালবাসার গল্প যেখানে আছে শুধু গতিময়তা, এক প্লট থেকে অন্য প্লটে জাম্প করে যাওয়া। মুহূর্তে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসা।

ছবির আশি শতাংশ আউটডোর। না, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা সিঙ্গাপুর নয়। এ যেন আমার বাংলাকে জনপ্রিয় ছবির আধারে আবার নতুন করে ফিরে দেখা। ঠিক মনে পড়ে না এর আগে এমনভাবে কোনও মফস্বল শহরকে দেখতে পেয়েছি কিনা সাদা পর্দায়। মালদা শহরটা তার যাবতীয় চরিত্র নিয়ে ধরা দেয়। আমরাও ঘুরে আসি গৌড়, উত্তরবঙ্গের তিস্তার ধার, কলকাতার বাস টার্মিনাস কিম্বা সেক্টর ফাইভ। এক জনপ্রিয় দক্ষিণী ছবির আধারে নির্মিত হলেও 'বোঝেনা সে বোঝেনা' আদ্যন্ত ঝেড়ে ফেলতে পারে তার যাবতীয় পরিগ্রহণ সম্পর্কিত তকমা। অসাধারণ সাবলীল ভাষায় কথা বলে প্রত্যেকে। তারা গান গায়, ঘুরে বেড়ায় এবং কোনও ভিলেন এসে ওদের পথ আটকায় না। খুব চেনা মানুষের এক অচেনা রূপকথার মধ্যে যেন আমরা টুপ করে ঢুকে পড়ি।

এই ছবির প্রধান মোচড় যদি হয় দুর্ঘটনা, তাহলে তার অনুষঙ্গ হিসেবে থাকে ভালবাসা। প্রায় আড়াই ঘন্টা ধরে যে নূর, রিয়া, অভীক, জয়ীকে দেখলাম; তাদের স্বপ্নের সঙ্গে গা ভাসালাম, খুনসুটিতে আস্কারা দিলাম, প্রেমটা মেনে নিলাম মনে মনে আর বারবার প্রার্থনা করলাম ‘ওরা যেন থাকে দুজনাতে’; সেটাই ছবির শেষে এসে বড় ধাক্কা খায়। এক অসমাপ্ত ভালবাসার সাক্ষী হয়ে থাকতে হয় আমাদের। নূরের বিয়ে করা হয় না রিয়াকে। যে নূর তার চিলেকোঠা থেকে তাকিয়ে থাকত রিয়ার ছাদের দিকে, যে নূর মাসের গোটা মাইনে খুইয়ে দিত মার্কেটিং-এ, যে নূর বলত 'ও রিয়া আমি তোমার সাথে থাকতে চাই', সেই নূর তো এখন রিয়ার সামনে চোখ বন্ধ করে শুয়ে। যে রিয়া খুব স্পষ্ট বক্তা, মুর্শিদাবাদের সেই অতি সহজ সরল গ্রামের ছেলেটাকে যে কখনও পাঠিয়েছে তার পুলিশ বাবার কাছে, কখনও পিছনে পড়ে থাকা পাড়ার বখাটে ছেলেটার কাছে মার খাইয়েছে, পরখ করে নিতে চেয়েছে সব কিছু, তারপর ভালবেসেছে হঠাৎ করে, সেও তো দেখছি নূরের নিথর দেহের ওপর আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে। আর বারবার বলছে, সে কথা দিয়েছিল একসঙ্গে থাকবে। অভীক হারায় বালুরঘাটের সেই শান্তশিষ্ট মেয়েটাকে, যে কলকাতায় এসে রাস্তা হারিয়েছিল। যাকে অভীক রাস্তা চিনিয়ে দিয়েছিল। একদিন সেই মেয়েই মাঝরাস্তায় ছেড়ে যায় তাকে। চলে যায় চিরদিনের জন্যে এক অচিনপুরে। মারা যাবার আগে বলে যায়, ভালবাসে সে; ভালবাসে গালে কাটা দাগওয়ালা ছেলেটাকে। হাসপাতালের বাইরে তখন আরও মৃতের সারি। আরও অসমাপ্ত ভালবাসার টুকরো টুকরো দেহ। সিনেমা হলে, আমার পাশেও তো তখন পিন পড়ার নৈঃশব্দ্য। আমার পাশেও প্রেমিকযুগলের আকুল কান্না। কেউ কাউকে বোঝাতে পারে না কিছু; তার মধ্যেই শেষ হয় ছবি। বছর শেষে মনের ওপর মেঘ জমিয়ে হল থেকে বের হই একা একা। বাইরে তখন ঝলমলে ডিসেম্বরের রোদ। আর অনেক দিন পর হাউজফুলের বোর্ডটা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে। শুভেচ্ছা রইল 'বোঝেনা সে বোঝেনা'-র সবাইকে। একটা অন্যরকম ছবি দিয়ে অনেক কিছু বোঝানোর জন্যে।

পরিচালক- রাজ চক্রবর্তী
প্রযোজনা- শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্ম
অভিনয়ে- সোহম, মিমি চক্রবর্তী, আবীর চট্টোপাধ্যায়, পায়েল সরকার প্রমুখ