বলিউডের যথাযথ সিক্যুয়েল

MAB Rating:
3

অনির্বাণ চৌধুরী
কলকাতা, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১২

Movie Review of Dabangg 2

মশলাদার বিনোদন আর হইচই চাইলে সেরা ঠিকানা দাবাং ২। ছবি- আরবাজ খান ফিল্মস।

এতদিনে বলিউড সিক্যুয়েল ছবি বানানো পুরোপুরি শিখে গিয়েছে, ‘দাবাং ২’-এর মতো খুব ঠিকঠাক সিক্যুয়েল আর একটাও আসেনি বলিউডে। মোটের ওপর ‘দাবাং’-এ যা ছিল, এই ছবিতেও দেখা গিয়েছে ওই একই ফর্মুলা- দুশমন ঠেঙিয়ে নায়কের এন্ট্রি, জয়োল্লাসে নাচা-গানা, নায়িকার পিছন পিছন রাস্তায় গানের নাচ, মধ্যে মধ্যে ভিলেন ঠেঙানো, ছবি শেষের সামান্য আগে আইটেম- ব্যস, আর কী চাই? তা হলে কি নতুন কিছুই নেই ‘দাবাং ২’ ছবিতে?

আলবাত আছে। সিক্যুয়েলে গ্রাম ছেড়ে কানপুরে চলে এসেছে চুলবুল পাণ্ডে। শহরে এসে উন্নতি করবে- এই তার মনোবাসনা। সে ইচ্ছা পূর্ণও হচ্ছে, গুন্ডাদমনের পাশাপাশি তাদের লুটে নেওয়া টাকায় তার সংসারে আসছে সুখ। শান্তি তো আছেই, সৎ-বাপ এখন তাকে সুনজরেই দেখে, ভাইটা তো আগের ছবি থেকেই দাদার পাশে, লক্ষ্মীমন্ত বউয়েরও বাচ্চা হল বলে! এসবের পাশাপাশিই কাঁটার মতো কেবল খচখচ করছে একটা নাম- বাচ্চা ভাইয়া! তাকে শায়েস্তা করতে পারলেই চুলবুলের জীবনের গাড়ি একটুও ঝাঁকুনি না দিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে যাবে।

সে ঝাঁকুনি চুলবুল কীভাবে থামাল, সেটা জানার জন্য সিনেমা হলে যাওয়াই ভাল! সিনেমা হলে যাওয়াটা আরও দরকার, কেননা চুলবুলের ওভার-সাইজ মস্তানি বড় পর্দাতেই খুলবে চমৎকার। আর কী আছে ছবিতে দর্শককে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করার জন্য?

সেটা ছবির চিত্রনাট্য! একটা ঠিকঠাক সিক্যুয়েল-এ পারম্পর্য থাকাটা খুবই দরকার- এ ছবি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে সেই টোটকা! এখানে তাই ঝুলন্ত ছবি হয়ে চুলবুলের মৃত মা পারম্পর্য বজায় রাখে, মান্যিগন্যি করলেও সৎ-বাপকে মিসড কল দিয়ে উত্যক্ত করতে ভোলে না চুলবুল। একই নিয়মে ফিরে আসে আগের ছবির সব চরিত্র। আর ইউপি-বিহারের মস্তানি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও পছন্দের একটা বাস্তব দলিল ধরে এগোয় ছবি। ভারসাম্য চোখে পড়ে পুরোপুরি বজায় রেখেছ চরিত্রদের কস্টিউম-এও, যা তাদের গ্রাম্য ইমেজের সঙ্গেও খাপ খেয়ে যায়।চুলবুলের স্ট্রাইপ জামা, তার বউয়ের গোলাপি কাঁচুলি আর নীল শাড়ি, সৎ-বাপের পাজামা-পাঞ্জাবি- কোথ্থাও তাল কাটেনি।

এরই সঙ্গে চিত্রনাট্যের আরেকটা ভাল জায়গা চরিত্রগুলোর বিবর্তন। দাবাং-এর সঙ্গে থাকতে থাকতে তার পরিবারেরও কারও আর ভয়ডর নেই; বউটা পর্যন্ত স্বামীর ওপর রেগেমেগে অনায়াসে চলে যায় নিষিদ্ধপল্লীতে! আর ভাইয়ের বউ নির্মলা? সে সটান এসে ঘাড় ধরে মাখ্খিকে নিয়ে যায় বিছানায়- বুঝিয়ে দেয় যে, সে সব দিক থেকেই সুপিরিয়র!

অবশ্য একই সঙ্গে চিত্রনাট্যে চোখে পড়েছে বেশ কিছু সরলীকরণের খেলা। বাচ্চা ভাইয়া একটা অনুষ্ঠানে কেন চুলবুলের ওপর খেপে যায়, তা যথেষ্ট স্পষ্ট করেননি পরিচালক। পাশাপাশি, নায়ক-খলনায়কের দ্বন্দ্বও এ ছবিতে কিছু কম। আগেরটার খলনায়ক ছেদি মাথা খাটিয়ে চুলবুলকে বেশ বেগ দিয়েছিল, বাচ্চা কিন্তু ততটা দিতে পারেনি। সে কেবল চুলবুলের বাচ্চাটাকে গর্ভেই মেরে ফেলে তাতিয়ে দিয়েছে এবং উপযুক্ত শিক্ষাও পেয়েছে।

অবশ্য সিনেম্যাটোগ্রাফির দিক থেকে এ ছবি খুবই ঝকঝকে এবং সে কারণে উপভোগ্যও। একেবারে শুরুতে পোস্টারছাপ টাইটেল-কার্ড থেকেই সেই মজা শুরু হয়েছে এবং ছবি যত এগিয়েছে, গুণগত মান বজায় রেখেছে। তার সঙ্গেই যোগ্য সঙ্গত করে গিয়েছেন অভিনেতারা। সলমন-ই ছবির সব। কেননা দাবাং তাঁর ব্র্যান্ড! তিনিই ছবিটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন, ফলে নাচে-অ্যাকশনে-কমেডিতে তিনি তুলনারহিত; এন্তার এন্টারটেনমেন্ট বিলিয়েছেন এই ছবিতে সলমন। আর তাঁরই উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খলনায়কের ভূমিকায় গা-শিউরে ওঠা অভিনয় করেছেন দক্ষিণের প্রকাশ রাজ। শুধুমাত্র শারীরিক মুদ্রা আর চাহনি দিয়েই লোকের মনে ভয় জাগিয়েছেন তিনি; তাঁর চেয়ে ভাল খলনায়ক সারা ভারতে বোধহয় এখন আর কেউই নেই!

পাশাপাশি, সমানে নজর কেড়েছেন সোনাক্ষি সিংহ। মধ্যবিত্ত গৃহবধূর চরিত্রে সোনাক্ষি অবিশ্বাস্য সাবলীল! তেমনই সন্তান-ভ্রূণ নষ্ট হয়ে গেলে প্রতিশোধকামী নারীর চরিত্রে তাঁকে দেখে গা-শিউরে ওঠে! বোল্ড নারী হিসেবে বলিউডে যে জায়গাটা তৈরি করেছেন মাহি গিল, ভাইয়ের বউয়ের চরিত্রে এ ছবিতেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেটা বজায় রেখেছেন তিনি।

আর মুন্নি? সে আছে তো ছবিতে? আলবাত আছে; সবাই যখন আছে, সেই বা কীভাবে বাদ যায়? তা, কেমন আছে সে? একটা গানের মাঝখানে এসে কবুল করেছে মুন্নি- ‘মুন্নি কা সারা রস লে লিয়া রে উর্দিওয়ালে রসিয়া’! পাশাপাশি, আগের ছবিটার চেয়ে কিছু বেশি বুকখোলা কাঁচুলি পরে পর্দা কাঁপিয়েছে সে। অবাক করেছে অবশ্য নতুন মুন্নি! এত স্পষ্ট যৌন-ইশারা সম্বলিত কোরিওগ্রাফি কমই দেখেছে বলিউড। তফাতের মধ্যে একটু খালি ক্লান্ত লেগেছে করিনাকে। তাই শীত-সন্ধেয় মাথা খালি করে শুধু মশলাদার বিনোদন আর হইচই চাইলে সেরা ঠিকানা ‘দাবাং ২’; ফুলটুস মজা ছবিটা বিলোচ্ছে জনতাকে!

পরিচালনা : আরবাজ খান
প্রযোজনা : আরবাজ খান ও মালাইকা অরোরা খান
সঙ্গীত : সাজিদ-ওয়াজিদ
সিনেম্যাটোগ্রাফি : অসীম মিশ্র
অভিনয় : সলমন খান, সোনাক্ষি সিংহ, প্রকাশ রাজ, করিনা কপূর, বিনোদ খন্না, আরবাজ খান, মাহি গিল প্রমুখ