যেখানে ভূতের ভয় নেই

MAB Rating:
4

কল্লোল লাহিড়ী
কলকাতা, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১২

Movie Review of Jekhane Bhooter Bhoy

সাহিত্যনির্ভর ভূত ফিরে এল আলোছায়ার ডলবি ডিজিটাল জগতে। ছবি- শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস ও সুরিন্দর ফিল্মস।

আপনি যদি মনে করেন শহরের শীতলতম দিনে সিনেমা হলে বসে বেজায় ভয় পেতে চাইছেন, তাহলে এই ছবি আপনার জন্যে নয়। যদি মনে করেন ভূত মানেই প্রতিশোধপরায়ণ, রক্ত পিশাচ, ঘাড় মটকে দেওয়ার অভিসন্ধিতে অলি গলি ঘুরে বেড়ায় কিম্বা নেহাতই ভয় দেখায়, তাহলে আপনার সেই ধারণাও ভুল। এই ছবি আসলে বাড়ির সবচেয়ে বড় সদস্যের সঙ্গে সবচেয়ে ছোট সদস্যের একই হলে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখার উৎসব। যা বাংলা ছবির বর্তমান মুহূর্তে ক্রমশ বিরল হতে চলেছে।

‘যেখানে ভূতের ভয়’ আমাদের বহু পরিচিত তিনটে গা-ছমছমে গল্পের সঙ্গে পরিচয় করায়। ‘অনাথ বাবুর ভয়’, ‘ব্রাউন সাহেবের বাড়ি’ এবং ‘ভূত-ভবিষ্যত’। প্রথম দুটি সত্যজিতের। তৃতীয়টি শরদিন্দুর। তিনটে আদ্যন্ত পৃথক গল্পকে একই ছবির ফ্রেমে ধরেন পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার সন্দীপ রায়। যোগসূত্রের কথাকার থাকেন তারিণীখুড়ো। গাছের তলায় তিনি বসান গল্প দাদুর আসর। সেখানেই বিস্ফারিত চোখে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া শহর শোনে ভূতের গল্প। তারিণীখুড়ো একের পর এক বিড়িতে টান দিতে দিতে ঠিক ঘনাদার মতো গল্পের আসর জমিয়ে দেন।

বাংলা সাহিত্যে লেখকদের কলমে ‘ভূত’ নিয়ে নানারকম চর্চা হয়েছে। ভূতের গল্পের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কিন্তু চলচ্চিত্রে? হাতে গোনা কয়েকটা সংখ্যা নিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অথচ আমাদের এবং পূর্বসূরীদের রক্তে বইছে ভূত নিয়ে নানা কান্ড-কারখানা আর সেই সব নিয়ে চায়ের দোকানে উত্তপ্ত আলোচনা। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং গুছিয়ে বসতেন প্ল্যানচেটের টেবিল। তাঁর ভূতেরাও পরিত্যক্ত বাড়িতে কিম্বা নির্জন গঙ্গার ঘাটে বসে নানা রকম গল্প শোনাত। ঠাকুরবাড়ির লোকজনদের ভূতেদের নিয়ে ছিল নানা রকমের কৌতূহল। কিন্তু পিছিয়ে ছিল না রায়চৌধুরী পরিবারও। উপেন্দ্রকিশোরের ভূতের রাজা আর এককাঠি এগিয়ে মানুষকে বর দিল সন্দেশ পত্রিকায়। ভূত তখন ভগবানের সমতুল্য। সুকুমার লিখলেন, “পরশু রাতে স্পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে/পান্তভূতের জ্যান্তছানা করছে খেলা জোছনাতে।” ভূতের ছানা জোছনাতে খেলা করল, ভূশুন্ডির মাঠে জমিয়ে বাসা বাঁধল, ফেলে যাওয়া মণিহার নিতে এল, কিন্তু কারও কোনও ক্ষতি করল না। গা-ছমছমে আবহাওয়ার মধ্যে কাউকে সে ভীষণ ভয় দেখাল না। আর ঠিক এখানেই বিদেশি সাহিত্যের ভূতের সঙ্গে চিরকালের জন্যে আলাদা হয়ে গেল বাংলার ভূত। বড় মায়া, বড় মমতায় ধরা থাকল গল্পের পাতায় পাতায়। তাই হয়তো নিজেদের গ্রামের চরম অপমান, অবজ্ঞা সব কিছু ভুলে এক যুদ্ধহীন পরিস্থিতিতে মানুষের মন জয় করে নিল বাংলার সেই অজ গাঁয়ের দুটো ছেলে। ভূতের রাজা গুপী আর বাঘাকে দিল নতুন জীবন। আর সত্যজিৎ তাঁর অনন্য ক্যামেরা-লেখনীতে তাদের দিলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

এই কথাগুলো এইখানে হয়তো এমনভাবে বলার অবকাশ হত না, যদি না সন্দীপ রায় বহুদিন পরে বাংলা চলচ্চিত্রে আবার ভূত নিয়ে নাড়াচাড়া না-করতেন। আমাদের দৃষ্টি আবার ভূতের গল্পের দিকে না ফেরাতেন। কিন্তু মনে পড়তেই পারে, বছরের প্রায় মাঝামাঝি তো আরও এক দঙ্গল ভূত নাচানাচি করে গেছে বাংলা ছবির সাদা পর্দা জুড়ে। ‘ভূতের ভবিষ্যতে’র মধ্যেই কোথায় যেন ঠিক হয়ে গেছে টালিগঞ্জে বসত লক্ষ্মীর ঠিকানা। কিন্তু সাহিত্যনির্ভর ভূত যেন অনেক দিন পর ফিরে এল আমাদের এই আলোছায়ার ডলবি ডিজিটাল জগতে। সেখানে ছবির প্রকৌশলগত নানা খামতি থাকলেও গোটা সিনেমা হল জুড়ে বড়-ছোট সবাই দেখল অনাথবাবুর সেই গা ছমছমে ভাঙাচোরা বাড়ি, ব্রাউন সাহেবের সাইমন, ভূত-ভবিষ্যতের মোহর ভরা ঘড়া। ছবি আবার গল্প বলল কোনও আতিশয্যের বাহুল্য না নিয়ে, মারপ্যাঁচের পথে না গিয়ে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।

শীত আসলে কমলালেবুর কোয়ার মতো পরতে পরতে লেগে থাকে বাঙালির উৎসবের সেলিব্রেশন। বড় দিনের ফ্রুট কেক, ছোটখাট পিকনিক, কিম্বা কাছে-দূরে বেড়িয়ে আসার ফাঁকেও মনের মাঝে থাকে খুঁতখুঁতানি। থাকে বাড়ির সবাই মিলে একটা ভাল ছবি দেখার ইচ্ছা। সেই সুযোগ যখন হাতের কাছে এসেই গেছে, আর গল্প যখন বলছেন স্বয়ং তারিণীখুড়ো, তখন আর বেশি দেরি করা উচিত নয়। সরাসরি টিকিট কাটুন ইন্টারনেটে... কিম্বা হলের সামনে রোদে পিঠ দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে। দেখে নিন যেখানে ভূতের ভয়, মনে কোনও রকম ভয় না রেখেই।

পরিচালনা : সন্দীপ রায়।
প্রযোজনা : শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস ও সুরিন্দর ফিল্মস।
অভিনয়ে : পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভ্রজিৎ দত্ত, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়, আবীর চট্টোপাধ্যায়, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়।