সেলুলয়েডে 'কাঙাল মালসাট'
নবারুনের 'কাঙাল মালসাট' এবার সুমন মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরায়
সুশোভন প্রামাণিক
কলকাতা, জানুয়ারি ১২, ২০১২
কাঙাল মালসাট' প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে। শুরুর পাতায় ছিল মিখাইল বুলগাকভ-এর লাইন, 'পান্ডুলিপিরা পুড়ে যায় না' আর প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে লেখা ছিল 'চলবে'। কিন্তু শেষ পাতায় চমক জাগিয়ে ছিল (চলবে না)। ২০০৫-এ 'তৃতীয় সূত্র' ও 'চেতনা'-র যৌথ প্রযোজনায় সেই নাটক মঞ্চভাষ পায়। নবারুণবাবুর তিনটি ছোট গল্প থেকে সুমন মুখোপাধ্যায়ই তৈরি করেন 'মহানগর@কলকাতা'। এবার নাটকের পরে সেই সুমন মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বড়পর্দায় আসতে চলেছে 'কাঙাল মালসাট'। উপন্যাসের চরিত্র পুরন্দর, ডি.এস, মদন, চোক্তার ভদি, বেচামনি, বেগম জনসন, কমরেড আচার্যরা।
নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট ও কবি পুরন্দর ভাট একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে ফ্যাতাড়ুদের আবির্ভাব এক চমক জাগিয়েছিল। হারবার্ট মৃতের সঙ্গে কথোপকথনের ব্যবসা করে। যা নেহাতই প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধী । নবারুন ভট্টাচার্যের উপন্যাস বা গল্পে এক প্রকার আলাদা স্বাদ বা ঝাঁজ থাকে একথা অনস্বীকার্য । ১৯৯৪ সালে লেখা 'হারবার্ট' উপন্যাস একসময় বাংলা সাহিত্যের ‘চেনা ভাষার’ বদলে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। সেই উপন্যাস সিনেমার পর্দায় ধরা দিয়েছিল পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। সময় এগিয়েছে 'শ্লীল-অশ্লীলের' এই ভেদাভেদ মুছেছে এখন অনেকটাই...আধুনিক সময়ে টিভির পর্দায় নানা রিয়েলিটি শোতে 'বিপ' শব্দের বহরে বা 'বাইশে শ্রাবণ', 'দিল্লি বেলি'-র মত সিনেমার পর 'গ' আর 'ব' দিয়ে শুরু সব অক্ষর, পরিভাষায় যাকে 'খিস্তি' বলে তা প্রেক্ষাগৃহে শোনা এখন দর্শকদের কাছে নেহাতই জলভাত। এখন এই সাহিত্যকীর্তি পড়ে বা শুনে নতুন প্রজন্মেরও চোখ কপালে উঠে যাওয়ার কথা নয়। যায়ওনি। এমনই এক জগৎ যেখানে চারপাশের সব কিছু অচেনা, অথচ ভীষণ পরিচিত।
সুমনবাবুর সঙ্গে আড্ডায় উঠে আসে এই সিনেমা তৈরির নেপথ্য ভাবনা। শুরুতেই তিনি জানান, এই উপন্যাস তাঁর অত্যন্ত প্রিয়, নাটকের সময় থেকে এর প্রকাশ ভঙ্গির ধরণ নিয়ে তাঁর ভাবনা চলেছে। মাঝে বেশ কিছুদিন ভাবনা থেমে ছিল কিন্তু আবার সেই ভাবনা মাথা চাড়া দেয়। আর এই সময়ে এই সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে একটা আলাদা প্রসঙ্গ থেকেই যায়। পশ্চিমবঙ্গে যে সময় পেরিয়ে গেল তা আক্ষরিক অর্থে 'ঐতিহাসিক'। সেটাকে এক অদ্ভুতভাবে নবারুণবাবু তাঁর ভাষার বুননে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু বার বার নবারুনের গল্পকে বেছে নেন কেন? তাঁর এ যাবৎ তিনটি সিনেমার মধ্যে দুটি নবারুণের গল্প থেকেই। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'যে ভাবে নবারুণদা রিয়েলিটি কে ট্রিট করেন তাকে বেশ নিজের মত বলেই মনে হয়। সবসময় যেন ওয়াকিং টাইটরোপ বিটউইন রিয়ালিটি অ্যান্ড আনরিয়ালিটি। তাতেও সিনেমার একটা ভাষা তৈরি হয়।
একই সঙ্গে সিনেমা বা মঞ্চে 'আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাংগুয়েজ' বা খিস্তির ব্যবহার নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। এই উপন্যাস বা গল্পগুলো সমাজের সেই প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে যাদের কথার ভাষায় এগুলো অনিবার্য ও অপরিহার্য। সুমন বলেন, 'যে ভাষা এতদিন মান্যতা পেয়েছিল বাবুদের ভাষা বলে, তা ক্রমাগত ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কাঙাল মালসাট যে শ্রেণির মানুষের কথা বলে, সেই গল্প বলতে গেলে যে ভাষাকে vehicle করতে হবে তা এমনই। বরং মধ্যবিত্তের মজ্জায় ক্রমাগত এই ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটছে। হুতোম প্যাঁচার নকশা থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রত্যেকের লেখায় আছে সেই ধার।বিষয়টি ওভাবে না বলতে পারলে তা 'ল্যাঙ্গুয়েজের পারভার্সন' মাত্র।'
এই সিনেমার গল্পে আরও অনেক চমক বাকি আছে। 'চতুরঙ্গ' ও 'রঞ্জনা আমি আর আসব না'র পর এই ছবিতে কবীর সুমন অভিনয় করছেন এক বিশেষ চরিত্রে। অন্যদের মধ্যে আছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু (দেব ডি), শান্তিলাল মুখার্জি, বিশ্বজিত চক্রবর্তী, জয়রাজ ভট্টাচার্য, অরুণ মুখোপাধ্যায়, উষসী, কমলিকা আরও অনেকে। তাঁর তিনটি ছবিতেই কবীর সুমন। এক সুমন আর এক সুমনের প্রসঙ্গে বলেন, 'ওঁর চেহারার মধ্যে যে আগুন লুকিয়ে থাকে, তাঁর চোখ, গলা এবং বলা সবই অনন্য। আমাদের সম্পর্কটা বহুদিনের সেই কবীরদার কলকাতা আসা থেকে। ওঁর গান এবং বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং জড়িয়ে থাকা। আমাদের সম্পর্কটা ভারি সুন্দর আর উনি পাশে থাকলে কাজটাও বেশ হয়।'
সিনেমার শুটিং শুরু হচ্ছে চলতি মাসের ২২ তারিখ থেকে। একসঙ্গে কাজ চলবে তাঁর আরও দুই সিনেমা 'শেষের কবিতা' ও হ্যামলেট অবলম্বনে 'প্রিন্স অফ মেটিয়াবুরুজ'-এর। মহানগর@কলকাতায় কাজের পরে সঙ্গীতে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন রূপম ইসলাম।এই সিনেমায় সঙ্গীত আয়োজন নিয়ে কি ভাবছেন তিনি? ময়ুখ ভৌমিক, প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি বা দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গে সুমন কাজ করেছেন নানা ছবিতে। তিনজনের সঙ্গে কাজ করতেই তিনি স্বচ্ছন্দ।সুমন জানালেন, ময়ুখকে এই সিনেমার জন্যে বলা হলেও এখনও পর্যন্ত কিছু ঠিক হয়নি।



















